কালের সাক্ষী হয়ে স্মৃতির ক্যামেরায় শ্যামনগর উপজেলার ইতিহাস ঐতিহ্যে

এস,এম মিজানুর রহমান শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি: সমুদ্রের নোনা জল বিধৌত এবং বনাঞ্চলে আবৃত বলে এই অঞ্চল প্রাচীন জনপদ বলে কখনও মনে হয়নি। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এই জনপদ কখনও বনভূমি কখনও জনভূমি। সময়ের এ এক অদ্ভুদ নিয়ম। জনপদ ধ্বংশ হয়েছে বনভূমি গড়ে উঠেছে, আবার জনপদ গড়ে উঠেছে, ধ্বংশও হয়েছে। কিন্তু কালের সাক্ষী হয়ে স্মৃতির ক্যামেরায় যেসব চিত্র চোখে পড়ে সে সব পুরার্কীর্তি খুব পুরানো নয় বড়জোর শ- পাচেক বছরের বা প্রতাপাদিত্য-মোঘল আমলের। কিন্তু প্রতাপাদিত্য যখন ঈশ্বরীপুরে যশোরেশ্বরী মন্দির পুন:প্রতিষ্ঠা করেন তৎপূর্বে সেখানে মন্দির বা জনবসতির ধ্বংশাবেশষ ছিল। সুতরাং প্রতাপাদিত্যের সংস্কারের বনভূমি ও ধ্বংশাবেশ আরও অতীত জনপদের সাক্ষ্য দেয়। সেসব সময়ের গুরুত্বপূর্ন নিদর্শন প্রাচীনত্বের প্রমান দেয়। শ্যামনগর উপজেলার অর্ন্তগত ঐতিহ্য বা পুরাকীর্তি সমূহের মধ্যে আজও দৃশ্যমান কীর্তিগুলোকে আমরা এভাবে উল্লেখ করতে পারি।

 

শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামে ১২ শতকের শেষার্ধে রাজা লক্ষন সেনের রাজত্বকালে শ্রী শ্রীঁ যশোরেশ্বরী দেবী মন্দির নির্মিত হয় বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন। রাজা প্রতাপাদিত্যর রাজধানী নির্মাণ কালে জঙ্গল পরিষ্কারের সময় ভগ্নাবস্থায় এই মন্দির ও কষ্ঠিপাথরের কালী মূর্তি উদ্ধার করেন। তারপর তিনি এই বিশাল মন্দিরটি পুনপ্রতিষ্ঠিত করেন। কবিরাম দিগি¦জয় প্রকাশ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, রাজা লক্ষন সেন ঈশ্বরীপুরে অবস্থিত যশোরেশ্বরী কালি মন্দির এবং তার উত্তর পূর্ব কোনে চন্ডি ভৈরবমন্দির নির্মান করেছিলেন। শ্রী শ্রী যশোরেশ্বরী কালি মন্দির মধ্যে আরও একটি অতি সুন্দর প্রতিমা ছিল। তা অন্নপূর্ন মুর্তি বলিয়া পুজিত ও পরিচিত হয়। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে উহা গঙ্গামুর্তি। যশোহর খুলনার ইতিহাস- সতিশচন্দ্র মিত্র-পৃ-৮৯-২য় খন্ড। শ্রী শ্রী যশোরশ্বরী দেবী মন্দির (ঈশ্বরীপুর কালী মন্দীর) শ্যামনগর বাসস্ট্যান্ড থেকে ৫ কিঃ মিঃ দক্ষিনে বংশীপুর বাসস্টান্ডের পূর্ব পাশে অবস্থিত।

 

হাম্মাম খানা, বংশীপুর, শ্যামনগর মায়ের বাড়ী কালি মন্দির থেকে আরো দক্ষিন দিকে অগ্রসর হইলে একটি প্রাচীন অট্টালিকা দেখিতে পাওয়া যায়, সেটাকে লোকে সাধারনত হাবসিখানা বলে। এর মধ্যে একপাশে একটি কূপ বলাহত, এই স্থানে কয়েদীদিগকে হাজতে বা বন্দী করিয়া রাখা হত। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে ইহা একটি স্নানাগার। পাশে সংলগ্ন কয়েকটি গৃহআছে এবং এটি প্রতাপাদিত্যের রাজকীয় অতিথিশালার অংশবিশেষ। এর মধ্যে চৌবাচ্চা, পানি চলাচলের পথ, ছাদে গম্বুজ এবং গম্বুজে বড় বড় ছিদ্র রয়েছে যা দিয়ে আলো বাতাস প্রবেশ করে। এর নির্মান কাল ষোলশ শতকের শেষ দিকে বলে জানাযায়। পাঁচ গম্বুজ বিশিষ্ঠ এই মসজিদ ১৫৯৯ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত বলেও জানা যায়। সতিশ চন্দ্র মিত্রের যশোর-খুলনার ইতিহাস মতে, ‘‘ হামাম খানা ছাড়িয়ে আর একটু দক্ষিন পশ্চিম দিকে অগ্রসর হইলে এক প্রকান্ড পুরাতন মসজিদ দেখিতে পাওয়া যায়। সরকারী রিপোর্টে এটাকে টেঙ্গা মসজিদ বলা হয়েছে। টেঙ্গা নামের উৎপত্তির কোন কারন জানা যায়না। ইহা যে প্রতাপাদিত্যের নতুন রাজধানীতে অবস্থিত মুসলমান সৈন্য ও রাজকর্মচারীগনের উপাসনা গৃহ বলিয়া নির্মিত সে বিষয়ে আর সন্দেহ নাই।

 

মসজিদ টি এক শ্রেনীতে পাঁচটি ঘরে বিভক্ত, প্রত্যেক ঘরের উপরে একটি গম্বুজ। মসজিদের বাহির পরিমান ১৩র্৬ – ৩র্৩র্, মধ্যস্থলে ঘরটির ভিতরের মাপ ২র্০র্- র্৯র্^র্ এবং পার্শ্ববর্তী অন্য চারটির প্রকত্যেকটি ১র্৮র্- র্৭র্^র্র্ । মেঝে হইতে গম্বুজের উচ্চতা ৩৬র্ ।

 

মধ্য ঘরের দরজার খিলান ৭র্ – র্৩র্ প্রশস্তএবং অন্য ঘরগুলির দরজার খিলান ৬র্ – র্৩র্ প্রশস্ত। বাগের হাটের খাঁনজাহান আলীর মাজার ব্যাতীত শক্ত মসজিদ এ প্রদেশে বড় কম দেখিতে পাওয়া যায়। মসজিদের পূর্বদিকে তিনদিকে প্রাচীর বেষ্টিত একটি চত্তর ছিল। এই চত্তরের উত্তর গায়ে সারি সারি কয়েকটি সমাধি দেখিতে পাওয়া যায়। সেগুলি বাবর উমরার কবর বলিয়া খ্যাত। জাহাজঘাটা নৌদূর্গ, খানপুর, শামনগর উপজেলার খানপুর গ্রামে অবস্থিত রাজা প্রতাপাদিত্যের জাহাজ ঘাটা নৌদূর্গ। যমুনা-ইছামতি নদীর পূর্বপাড়ে এ জাহাজঘাটার রনতরী তৈরী ও মেরামোতের কাজ হতো। মুঘল আক্রমন প্রতিহত করতে রাজা প্রতাপাদিত্য শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলেন। এখানে ছিল তার প্রধান কার্যালয় ও পোতাশ্রয়। জাহাজঘাটার একটি মাত্র ভবনভেঙ্গে-চুরে এখনও কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে। উত্তর-দক্ষিনে লম্বা এ ভবনটিতে ছয়টি কক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে অফিস, মালখানা, শয়নকক্ষ ও ¯œানাগার ছিল। এই ভবনের একঅংশে কোন জানালা নাই। ছাঁদের গম্বুজে বড় বড় ছিদ্র। সেজন্য ঘরের মধ্যে প্রয়োজনীয় আলো প্রবেশ করে। ঐ ছিদ্রে স্ফটিক বা স্বচ্ছ কাঁচ বসানো ছিল বলে ঐতিহাসিকেরা মনে করেন।

 

ঈশ্বরীপুরের হাম্মাম খানার সাথে এর কিছু সাদৃশ্য দেখা যায়। জাহাজ ঘাটার নির্মান করা
হয়েছিল ষোল শতকের শেষ দশকে। কালিগঞ্জ থেকে শ্যামনগর যাওয়ার পথে মৌতলা পার হলেই খানপুর। পাকা রাস্তার পূর্ব পাশে এর অবস্থান জাহাজঘাটার পাশে নৌ-সেনাপতি ডুডলির নামানুসারে বর্তমান দুদলী গ্রামে নৌকা, জাহাজ নির্মান ও সংরক্ষনের ডক ছিল। (পল্টু বাসার পুরাকীর্তি) সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলারঈশ্বরীপুর গ্রামে বাংলাদেশের প্রথম খ্রিস্টান গির্জা অবস্থিত ছিল। ১৫৪০খ্রিস্টাব্দে ইগ্নেসিয়াস লয়োলা নামক একজন স্পেনিস ব্যক্তির নেতৃত্বে জেসুইট বা যিশু সম্প্রদায় গঠিত হওয়ার পর খ্রিস্টধর্ম প্রচার ও প্রসারের জন্য খ্রিস্টানগণ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েন। সে আমলে এ মহাদেশে খ্রিস্টধর্ম প্রচার সম্পর্কিত তথ্যাদি পাওয়া যায় পিয়ারে ডু জারিক নামক একজন ফ্রান্সবাসী ঐতিহাসিকের ইতিহাস থেকে ডু জারিকের তথ্যানুযায়ী সে সময়ে বাকলা, শ্রীপুর ও যশোহর নামে তিনটি হিন্দু রাজ্য ছিল।

 

তথ্যাদি থেকে আরো জানা যায় , ফনসেকা নামক একজন খ্রিস্টান পাদ্রী নদীপথে ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২০ নভেম্বর প্রতাপাদিত্যের রাজধানী ঈশ্বরীপুরে পৌছান । সেখানে তিনি অন্য একজন খ্রিস্টান পাদ্রী ফাদার সোসার সাক্ষাৎপান। অত:পর ফাদার সোসাও ফনসেকা ২১ নভেম্বর প্রতাপাদিত্যের দরবার কক্ষ বারদুয়ারীতে উপস্থিত হয়ে রাজাকে বেরিঙ্গান নামের এক প্রকার সুস্বাদু কমলালেবু উপহার দেন এবং বারদুয়ারী ভবনের উত্তর-পূর্ব কোণে যেখানে খ্রিস্টান পল্লী অবস্থিত সেখানে একটি গির্জা নির্মাণের প্রস্তাব করেন ।প্রতাপাদিত্য আনন্দের সঙ্গে এ প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করেন। প্রতাপাদিত্যের ফরমান পাওয়ার পরই গির্জা নির্মাণের কাজ শুরু হয়ে যায়। ঐ সময়ে প্রতাপাদিত্যের সৈন্য বাহিনীতে বহু পর্তুগীজ সৈন্য কর্মরত ছিলেন ।গির্জা নির্মাণের জন্য তারাসাধ্যমত অর্থ সাহায্য করেন। এছাড়া প্রতাপাদিত্য নিজের রাজধানীতে খ্রিস্টানদের উপাসনালয় নির্মাণের জন্য প্রভূত সাহায্য সহযোগিতা করেন ।১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে গির্জার নির্মাণ কাজ শেষ হয়। নির্মাণ সময় বিচারে যশোরের ঈশ্বরীপুর গ্রামের গির্জা বাংলাদেশের নির্মিত প্রথম খ্রিস্টান গির্জা ।

 

গোপাল গোবিন্দদেবের মন্দির, গোপালপুর, ঘোষপাড়া, শ্যামনগরঃ এ মন্দির গুলো নির্মিত হয়েছিল ১৫৭৭-১৫৯৫ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে। শ্যামনগর বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে যমুনা নদীর পশ্চিম পাড়ে গোপালপুর ঘোষপাড়ার এই মন্দিরটি অব¯িথত। এখানে মোট চারটি মন্দিরের মধ্যে এখন একটিই মাটির স্তুপের মত ভেঙে-চুরে ছাদবিহীন দাঁড়িয়ে আছে জঙ্গলের মধ্যে। রাজা প্রতাপাদিত্য উড়িস্যা বিজয়ের সময় বিগ্রহটি এনেছিলেন এবং তার কাকা বসন্তরায় এ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শ্যামনগর বাসস্ট্যান্ড থেকে ৩ কিঃ মিঃ পূর্বে নকিপুরে অবস্থিত জমিদার রায় বাহাদুর হরিচরন রায় চৌধুরীর বাসভবন, নহবতখানা ও দীঘি সংলগ্ন মন্দির। রাজা প্রতাপাদিত্যের পর তিনিই ছিলেন শ্যামনগরের বড় জমিদার। উপরে উল্লেখিত ঐতিহ্য ছাড়াও বিলুপ্তপ্রায় অনেক কীর্তি এই এলাকায় আজও বিদ্যমান। এর মধ্যে সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য রাজা প্রতাপাদিত্যের গড় বা দূর্গ। বহিশত্রুর আক্রমন প্রতিহত করার জন্য এ সকল দূর্গ নির্মিত হয়।

 

এসব গড় বা দূর্গ সংলগ্ন বড় বড় দীঘি। শরৎবালা দীঘি, কামান স্থাপনের জন্য মাটির উঁচ ঢিবি, নুরউল্লাহ খার মাজার, গোপালপুর দীঘি, জোড়া শিবের মন্দির ইত্যাদি।

SHARE