• রবিবার, ১৪ জুলাই ২০২৪, ১১:১৫

গল্প: অন্য মামা

প্রতিনিধি: / ৬০ দেখেছেন:
পাবলিশ: বুধবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৪

শতদ্রু মজুমদার

সকাল বেলা মামা বলল, ‘ঘন্টি তোর সঙ্গে একটা জরুরি কথা আছে রে’
‘কী কথা মামা?’
‘তোর মায়ের যে একটা কবিতার খাতা ছিলৃ’
কেড়ে নিয়ে বললাম, ‘ছিল। আমিও শুনেছি। চোখে কোনোদিন দেখিনি। কেন? কী হবে?’
মামা বলল, ‘আজ গুরুদাস হলে সারাদিনব্যাপী কবিসভাৃ’
আমি বললাম, ‘তাতে তোমারই বা কী, আমারই বা কী! আমরা তো কেউই কবিতা লিখি না।’
মামা বলল, ‘লিখি না। কিন্তু আজ লিখব। একটা কবিতা পড়লে খেতে দেবে, জানিস!’
‘কেন, তুমি কি খেতে পাও না?’
‘পাই। কিন্তু কবিসভার ভাত কখনও খেয়েছি কি?’
আমি এক গাল হেসে বললাম, ‘ওও ! ওই জন্য তুমি মায়ের কবিতার খোঁজ করছ? ঐখান থেকে একটা গ্যাঁড়া মেরে নিজের নামে চালাবে?’
সবাই জানে, আমার মামা ভাঙবে কিন্তু মচকাবে না। তাই একটা বিড়ি ধরিয়ে বলল, ‘দূর বোকা! তোর মা’র কবিতা আমার নামে চালাতে যাব কেন? দিদির নামেই পড়ব। স্নেহলতা দেবীর কবিতা এখনকার কজন পড়েছে? বলব, তিনি অসুস্থ, আসতে পারেননি। তাই আমাকে দিয়ে এই কবিতাটা পাঠালেন।’
‘এসব কথা মা জানে? আচ্ছা, আমিই গিয়ে জিজ্ঞেস করছি।’
এগিয়ে যাচ্ছিলাম, মামা খপ করে হাতটা ধরল‘তোকে কিছু বলাও মুশকিল! মা’কে এসব বলতে হবে না।’
আমি মাকে কিছু বলিনি ! তবে আলমারি খোঁজাখুঁজি করে একটা পুরনো শিশুসাথী পত্রিকা পেলাম। তাতে মা’র একটা কবিতা, নাম‘ছোট্ট জিজ্ঞাসা’! মামাকে দেখাতেই বলল, কাজের কাজ করেছিস। এই কবিতাটাই আমি পড়ব। আমার মায়ের কবিতা পাঠ হবে তাতে আমি খুব খুশি। বললাম, এই ভালো খবরটা কিন্তু মাকে জানানো দরকার। মামা রেগেমেগে বলল, ‘এখুনি কিচ্ছু জানানোর দরকার নেই।’
বলেই মামা আমাকে নিয়ে সোজা হলে হাজির ! দেখলাম। সে কী হই হই ব্যাপার রৈ রৈ কাÐ! বাড়ির ছাদে দু’মুখো দুটো মাইক, গান বাজছে, ‘অবাক পৃথিবী অবাক যে বার বার!’
অবাক কাÐই বটে ! গাছের ডালে ঝুলছে :
ধুলো ওড়াই কবিতা পাই / বাইবেল-কোরান-গীতা সবই আমার কবিতা / সবার উপরে কবিতা সত্য!
হলে ঢোকার মুখেই একজন টেবিল চেয়ারে বসে। তার সাদা পাঞ্জাবি ভর্তি কীসব লেখা! মনে হচ্ছে কবিতার লাইন। মাথায় কাগজের লম্বা টুপি। অনেকটা চানাচুরওয়ালার মতো। তাতেও কবিতা! একটা লাইন পড়তে পারলাম, ‘কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি’। অনেক কষ্টে হাসি চাপলাম। ছুটি দিয়েছে তো মাথায় নিয়ে বসে আছে কেন, বুঝলাম না।
মামা নাম সই করল। সঙ্গে সঙ্গে হাতে ধরিয়ে দিল একটা প্যাড আর ডট পেন। চা বিস্কুট খেতে খেতে বললাম, ‘মামা এই প্যাডে কি আমার মায়ের কবিতাটা টুকে নেবে?’
মামা বেশ গম্ভীর হয়ে বলল, ‘না রে, ভাবছি আমি নিজেই একটা কবিতা লিখব। এদের এসব কাÐকারখানা দেখে আমার খুব কবিতা লিখতে ইচ্ছা করছে!’
“তাই নাকি?’
‘পাশাপাশি সময় পেলে তোর মায়ের কবিতাটাও পড়ব।’
আমি বললাম, ‘মায়ের কবিতাটা আমি পড়ি না?’
‘না না, তুই পড়বি কী? স্টেজে উঠে ঘাবড়ে যাবি। সে আরেক বিচ্ছিরি কাÐ হবে। পড়লে আমিই পড়ব।
আমি আর কি বলব! মামা আজ মায়ের কবিতাই নিজের নামে চালাবে। হলের ভিতরে বসে সেটা ওই নতুন প্যাডে টুকলি করবে। মামা সব পারে!
বিশাল হল। সারি সারি চেয়ার। রকমারি লোক বসে। জীবনে এই প্রথম এত কবিকে একসঙ্গে দেখলাম। আমার ধারণা ছিল, কবি মানে ধুতি পাঞ্জাবি পরা গোঁফওলা লোক, মাথার চুল বেশ লম্বা, চোখে চশমা থাকবে। আমাদের ইস্কুলে সংস্কৃত মাস্টার বাংলায় কবিতা লিখতেন। তাঁকে ঠিক ওইরকম দেখতে ছিল। এখানে তেমন একজনকেও দেখলাম না। সবাই প্যান্ট শার্ট, লাল নীল গেঞ্জি পরা। কারও মাথায় উল্টো টুপি, কারও এক কানে দুল। একটা লোকের মাথার সব চুল সাদা, তার পরনে কলারঅলা লাল গেঞ্জি। এদের দেখে মনে হচ্ছে, সবাই এখানে যাত্রাপালা বা থিয়েটার দেখতে বা বিজয়া সম্মেলনে এসেছে।
সে যাই হোক গে, একসাইডে বসলাম আমরা। কবিতা শোনায় মন নেই আমার, কবিদের দেখছি মন দিয়ে। দাঁড়িয়ে থাকা একজন, চুন উড়িয়ে দিব্বি খৈনি গুঁজলো ঠোঁটের খাঁজে। লাল চুলের এক মহিলা বললেন, ‘যদি কিছু মনে না করেন, এই জায়গাটা আমার।’ আমি অবশ্যই মনে করেছি। কারণ, ফাঁকা ছিল, বসে পড়েছি। কারও তো কোনও চেয়ার কেনা নয়। তবু কিছু না বলে পেছনের একটা খালি চেয়ারে বসলাম।
মামা কিছু বলল না। ক্লাশের ভালো ছেলের মতো সে তখন মন দিয়ে শুনছে, আবার কীসব লিখছে! একবার দেখতে চেয়েছিলাম, ধমকে উঠল, ‘চুপ করে শোন!’ আমি আর কী বলব! যে লোকটা গল্প-কবিতা থেকে একশো হাত দূরে, সে লিখছে কবিতা? কী ভেলকি দেখাবে কে জানে!
মাইকে ঘোষণা হল: এখন কবিতা পড়বেন ভারতবর্ষের একমাত্র ভিক্ষুক কবি গণেশ হাওলাদার!
সাদা পাজামা পাঞ্জাবি আর চোখে কালো চশমা একজনকে ধরে ধরে স্টেজে তোলা হল। তাঁর হাতে কোনও কাগজপত্র নেই। মুখে মুখেই তিনি পদ্য বলতে পারেন!
‘নমস্কার, আজ আমি স্বাধীন সিরিজের কয়েকটি পদ্য শোনাচ্ছি
স্বাধীন মানেই কারচুপি
স্বাধীন মানেই চাপ
স্বাধীন মানেই চাপে পড়ে
আচ্ছা মরণ-ঝাঁপ ! (যেটা যাদবপুরে হয়েছে !)
হল জুড়ে তুমুল হাততালি। ঘুলঘুলি থেকে কটা গোলাপায়রা বেরিয়ে ফর ফর করে উড়ে গেল।অমনি কবি বলে উঠলেন—
‘সূর্য স্বাধীন চন্দ্র স্বাধীন
সত্যি কি স্বাধীন আমরা?
মুক হলেও হয়তো স্বাধীন
অট্টালিকার পায়রাৃ’
অনর্গল এমনই ডজনখানেক ছোট ছোট কবিতা শুনিয়ে ফের হাততালি তুলে হাওলাদার স্টেজ থেকে নেমে গেলেন। সত্যি বলতে কি, এখন পর্যন্ত যতগুলো শুনলাম তার মধ্যে ভিক্ষুক কবির কবিতাই আমার মতে শ্রেষ্ঠ, মনেও থাকবে।
আবার ঘোষণা হল: ‘এখন কবিতা পড়তে আসছেন বাঁকুড়া থেকে আগত কবি শুকসারি! আপনাদের অবগতির জন্য জানিয়ে রাখি, এঁরা স্বামী-স্ত্রী মিলে একটি কবিতা রচনা করেন। এটাই ওঁদের কাব্য-বৈশিষ্ট্য।
দুটো মাইকের সামনে দুজন দাঁড়াল। একজন মহিলা, একজন পুরুষ ! দুজনের হাতে দুটো কাগজ। এ একটা লাইন বলে, সে একটা।
‘আছো কেমন?
বেঁচেবর্তে যেমন তেমন!
কী বাহবা শ্বাসে জলে!
পড়েছি খুড়োরকলে!
হায় কী বেহাল জি.টি.রোড?
শেরশাহের ডাউনলোড!’
ভাট বকেই চলেছে, অনেকটা ঠিক তরজা গানের মতো! সেটা হলেও বরং ভালো হত, একটু মজা পাওয়া যেত। ওদের আর একটা বৈশিষ্ট্য লক্ষ করলামদাঁড়ি-কমা-ড্যাস -সেমিকোলন-জিজ্ঞাসা চিহ্ন এগুলো সব মুখে মুখে বলে দিল।
দুপুর দুটো নাগাদ মামার ডাক এল। আমি নড়েচড়ে বসলাম, মাইকের সামনে তালেবরের মতো মামা দাঁড়াল!
‘নমস্কার, আমার কবিতার নাম ‘জগাখিচুড়ি’ৃ বলেই যাত্রা করার ঢঙে, কী যে পড়ল মাথামুন্ডু কিছুই বুঝলাম না! হাততালিও দিল অনেকে! খুব ছোটবেলায় আমাদের পাড়ার কেষ্টা পাগল সাদা কাগজে হাবিজাবি লিখে এনে, মাকে পড়ে শোনাতো, তারপর বলত, ‘বৌদি এবার তালের বড়া খাওয়ান।’ মামার কবিতা অনেকটা সেইরকম।
স্টেজ থেকে নেমে এসে মামা বলল, ‘চ একটা বিড়ি খেয়ে আসি।’ যেন রাজ্য জয় করে এল! পকেটে হাত দিয়ে বিড়ি বের করতে যাবে অমনি একজন এসে বলল, ‘নমস্কার দাদা দারুণ কবিতা লিখেছেন, একটা সিগারেট খান।’
মামা জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার নাম?’
ছেলেটা গম্ভীরসে বলল, ‘আমার নাম হারাধন ধারা। কুম্ভকর্ণ ছদ্মনামে আমি কবিতা লিখি।’
মামা বলল, ‘আপনি কি ঘুমোতে খুব ভালোবাসেন?’
‘না, এই নামটা এখন পর্যন্ত কেউ নেয়নি তো, তাই !’
মামা বলল, ‘ওরাং ওটাং নামটাও তো এখনও কেউ নেয়নি!’
লোকটা বলল, ‘না আমার বাছাইটা ধর্মগ্রন্থ থেকে!’
‘ওহ আচ্ছা!’
তারপর সে বলল, ‘আপনি নিশ্চয়ই আমার কবিতা পড়েছেন?’
এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে মামা বলল, ‘হ্যাঁ পড়েছি তো!’
আসলে পড়েনি !
লোকটা হাসি হাসি মুখ করে বলল, ‘আমার একটা লাইন আর আপনার কবিতার একটা লাইন সেম!’
‘কোন লাইনটা বলুন তো?’
‘ওই যে, অরাজকতায় শুধুই বিবমিষা!’
‘ও আচ্ছা!’
‘ঠিকই বলেছেন, আমার আপনার সকলের ভেতরে ভেতরে চলছে বিবমিষা’
মামা চুপ! কারণ বিবমিষা’র মানেটাই জানে না। অমনি আর এক ভদ্রমহিলা বললেন, ‘হ্যাঁ আমার কবিতার একটা লাইনও মিলে গেছে!’
মামা বলল, ‘আপনার কবিতার লাইন?’
‘ওই যে, কেবলই যাতনাময়!’
‘কী আশ্চর্য !’
‘আশ্চর্যের কী আছে দাদা! আমরা সবাই তো একই যন্ত্রণার শরিক।’
এক বৃদ্ধ বললেন, ‘খুব সুন্দর লিখেছেন ভাই!’
মামা বলল, ‘আমাকে বলছেন?’
‘হ্যাঁ আপনাকে বলছি। কী অপূর্ব! উত্তাল তরঙ্গ রে! অবিশ্যি ঐ লাইনটার জন্য আমি রবি ঠাকুর প্রভাবিত।’
আমি মনে মনে বলি, চোরের ওপর বাটপারি !
মামা চুপ।
বৃদ্ধ বললেন, ‘আপনিও নিশ্চয় রবীন্দ্রসংগীত ভালবাসেন?’
‘হ্যাঁ, সে আর বলতে!’
ফের মিথ্যে! সিনেমার হিন্দি গান ছাড়া অন্য কোনও গান মামাকে কোনোদিন শুনতে দেখিনি। সেই লোক নাকি রবীন্দ্রসংগীতের ভক্ত? এ তো দিনকে রাত করে দেওয়া! আমি মামাকে টেনে নিয়ে বাইরে চলে এলাম। আর বেশিক্ষণ থাকলে দুজনেই এক সঙ্গে পাগল হয়ে যাব। তারপর বললাম, ‘সত্যি করে বল তো মামা ব্যাপারটা কী?’
‘ব্যাপার কিছুই না, আটজন কবির একটা করে লাইন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লিখে সেটাই গিয়ে পড়ে এলাম মঞ্চে!’
‘কিন্তু কবিতার তো একটা মানে থাকে?’
‘যে শুনবে সে মানে করে নেবে। এই যে আকাশের চাঁদ এর কতরকম মানে হয় জানিস?
আমি বললাম, ‘চাঁদের তো একটাই মানে, পৃথিবীর উপগ্রহ!’
মামার সেই এক কথা, ‘একটা পাশ করলে তুই এটা বলতিস না।’
আমি মাধ্যমিক ফেল। এটা সবাই জানে। কিন্তু তার সঙ্গে এসবের কী সম্পর্ক? রাগ হজম করে বললাম, ‘কী বলতে চাইছ বল তো?’
সবজান্তার মতো মামা বলল, ‘ভ‚গোলের কথা ছাড়! কবিতায় কেউ চাঁদকে বলে প্রিয়ার মুখ, কেউ শিশুর হাসি, কেউ কাস্তে, কেউ পোড়া রুটি, আবার কেউ বলে, উজ্জ্বল ফাঁদ! আধুনিক কবিতাও তাই! এক একজনের কাছে এক একরকম মানে, কোনোটাই সঠিক নয়, আবার ভুলও নয়।’
বললাম, ‘আমার খিদে পেয়ে গেছে।’
‘হ্যাঁ, তা তো পাবেই। জীবনে খাওয়া ছাড়া আর কী করলি! চ খেয়ে নিই! তবে তোকে খেতে দেবে কিনা জানি না!’
আমার পেটে খিদে, মুখে অন্য কথা বললাম, ‘না দিক, তুমি খাবে আমি দেখব।’
‘মানে?’
‘দুটো পাশ করে তুমি এর মানে জানো না?’
‘জানি না বলেই তো বলছিৃ’
‘অন্যের কবিতা নিজের করে যদি তোমার মন ভরে, তা হলে তোমার খাওয়া দেখে আমার পেট ভরবে।’
মামা চুপ। মনে হচ্ছে, উত্তরে কী বলবে তার ভাষা হাতড়াচ্ছে।


এই বিভাগের আরো খবর
https://www.kaabait.com