কারও কাছে রূপসী ম্যানগ্রোভ মানে প্রকৃতির সৌন্দর্য, নির্মল বাতাস আর একটু প্রশান্তির খোঁজ। কেউ আসেন পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, কেউবা প্রিয়জনের হাত ধরে। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেই প্রতিদিন জীবনের সঙ্গে লড়াই করে চলেন কিছু মানুষ। তাদেরই একজন আকাশ হোসেন।
কাঁধে একটি কফির ফ্লাস্ক ঝুলিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রূপসী দেবহাটা ম্যানগ্রোভের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ান আকাশ। কখনো প্রচণ্ড রোদ, কখনো বৃষ্টি—কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারে না। পর্যটকদের কাছে ঘুরে ঘুরে কফি বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি।
আকাশ হোসেন দেবহাটা উপজেলার সুশীলগাতি গ্রামের আফছার আলীর ছেলে। বাবা-মাকে নিয়ে তার ছোট্ট সংসার। পরিবারের আয়ের প্রধান, বরং একমাত্র অবলম্বন এই কফি বিক্রি। প্রতিদিন কফির ফ্লাস্ক কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। পর্যটকদের কাছে এক কাপ এক কাপ করে কফি বিক্রি করেন, আর দিন শেষে সেই সামান্য উপার্জনেই চলে পরিবারের প্রয়োজন।
এক কাপ কফির দাম হয়তো একজন পর্যটকের কাছে খুবই সামান্য। কিন্তু সেই এক কাপ কফির পেছনে লুকিয়ে থাকে আকাশের ঘাম, ক্লান্তি আর পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ। প্রতিটি বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তার বাবা-মায়ের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার স্বপ্ন।
রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে সংগ্রাম
জীবন তাকে খুব বেশি সুযোগ দেয়নি। তাই সুযোগের অপেক্ষায় বসে না থেকে নিজের কর্মসংস্থান নিজেই তৈরি করেছেন আকাশ। কাঁধে কফির ফ্লাস্ক তুলে নিয়েছেন। রোদে শরীর পুড়লেও, বৃষ্টিতে ভিজলেও তার পথচলা থামে না।
পর্যটকদের ভিড় দেখলেই তার চোখে যেন নতুন আশার আলো জ্বলে ওঠে। কারণ দর্শনার্থী যত বেশি, তার কফি বিক্রির সম্ভাবনাও তত বেশি। তাই ছুটির দিনগুলো তার কাছে শুধু অন্যদের আনন্দের দিন নয়—এগুলো তার পরিবারের জন্য একটু বেশি উপার্জনের আশার দিন।
প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে রূপসী ম্যানগ্রোভ
সবুজের গভীরতা, নদীর নির্মল বাতাস, পাখির কলকাকলি আর চোখজুড়ানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে রূপসী দেবহাটা ম্যানগ্রোভ যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক অপূর্ব ছবি।
একদিকে বাংলাদেশ, অন্যদিকে ভারত; মাঝখানে সীমান্ত নদী ইছামতী। নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা ‘রূপসী দেবহাটা ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্র’ এখন সাতক্ষীরার অন্যতম আকর্ষণীয় বিনোদনকেন্দ্র। ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি ভুলে একটু স্বস্তি আর প্রশান্তির খোঁজে প্রতিদিনই এখানে ছুটে আসছেন নানা বয়সী মানুষ।
দেবহাটা উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত পর্যটনকেন্দ্রটি বর্তমানে নতুন সাজে সেজেছে। ছুটির দিন, বিভিন্ন উৎসব ও পর্যটন মৌসুমে দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে ‘মিনি সুন্দরবন’খ্যাত রূপসী ম্যানগ্রোভ।
আর এই পর্যটকদের ঘিরেই আকাশের মতো অনেক শ্রমজীবী মানুষের জীবনে তৈরি হয়েছে আয়ের সুযোগ।
আকাশের গল্প শুধু কফি বিক্রির গল্প নয়
আকাশের কাঁধে ঝুলছে শুধু একটি কফির ফ্লাস্ক নয়—ঝুলছে একটি পরিবারের দায়িত্ব। তার প্রতিটি পদক্ষেপে আছে সংগ্রাম, প্রতিটি কাপে আছে পরিশ্রম, আর প্রতিটি দিনের শেষে আছে বাবা-মাকে নিয়ে বেঁচে থাকার ছোট্ট স্বপ্ন।
হয়তো তার হাতে দামি মোবাইল নেই, নেই বড় কোনো ব্যবসা কিংবা চাকরির পরিচয়। কিন্তু আছে পরিশ্রম করার সাহস, বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং হাল না ছাড়ার মানসিকতা।
রূপসী ম্যানগ্রোভে যারা বেড়াতে আসেন, তারা হয়তো প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে ফিরে যান। কিন্তু আকাশের মতো মানুষগুলো প্রতিদিন সেই সৌন্দর্যের মাঝেই নিজেদের জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকেন।
তার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
জীবনে বড় হতে বড় কিছু প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন হয় সৎভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা আর পরিবারের জন্য নিরলস পরিশ্রম করার মানসিকতা।
আকাশ হয়তো কফি বিক্রি করেন, কিন্তু তার প্রতিটি কফির কাপে মিশে থাকে একজন সন্তানের দায়িত্ব, একজন মানুষের আত্মসম্মান এবং একটি পরিবারের বেঁচে থাকার স্বপ্ন।
" বিবিসি সাতক্ষীরা "
সম্পাদক ও প্রকাশক : আব্দুল মতিন।
মেইল- bbcsatkhira@gmail.com ঠিকানা- পাটকেলঘাটা, সাতক্ষীরা, বাংলাদেশ।
""বি:দ্র: এই সাইটের কোন লেখা বা ছবি কপি করা আইনত দন্ডণীয়""
zahidit.com