খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় স্থানীয় পর্যায়ে কাজের তীব্র অভাব এবং নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে জীবিকা নির্বাহ করতে নারী ও শিশুসহ হাজার হাজার নিম্নআয়ের মানুষ দেশের বিভিন্ন জেলার ইটভাটায় পাড়ি জমাচ্ছেন।
স্থানীয় পর্যায়ে স্থায়ী কর্মসংস্থান বা পর্যাপ্ত দৈনিক কাজের সুযোগ থাকে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় নিম্নআয়ের ও মধ্যবিত্ত মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়া। বাধ্য হয়ে পরিবার-পরিজন বা সন্তানদের খাওয়ার খরচ ও পড়ালেখার খরচ জোগাতে দূর-দূরান্তের ইটভাটায় শ্রমিকের কাজে যেতে হচ্ছে।
কাজের অভাব এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে হাজার হাজার দিনমজুর ও শ্রমিক জীবিকার সন্ধানে নিজ জেলা ছেড়ে বিভিন্ন জেলার ইটভাটায় কাজে যোগ দিচ্ছেন। সাধারণত বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ার পর, অর্থাৎ কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাস থেকে দেশজুড়ে ইটভাটাগুলোর নতুন মৌসুম শুরু হয়, যা চলে পরবর্তী বর্ষার আগ পর্যন্ত।
উপকূলীয় জেলাগুলোর মতো যেসব এলাকায় মরা কার্তিক বা নির্দিষ্ট সময়ে কৃষিকাজ থাকে না, সেখানকার মানুষ কাজের খোঁজে বাধ্য হয়ে ইটভাটায় যান। ইটভাটার মালিক বা সর্দার (শ্রমিক সরবরাহকারী) শ্রমিকদের অগ্রিম বড় অঙ্কের টাকা (দাদন) দেন, যা দিয়ে দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের জরুরি পারিবারিক প্রয়োজন মেটায়। পরবর্তীতে ইটভাটায় হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে এই টাকা শোধ করতে হয়। ইটভাটার কাজগুলোতে অনেক সময় একা না গিয়ে পুরো পরিবার স্ত্রী-সন্তানসহ শ্রমিকরা চলে যান, যাতে সবাই মিলে কাজ করে বেশি আয় করা যায়।
প্রতিদিন বাস-ট্রাকযোগে দেশের বিভিন্ন জেলার ইট ভাটায় কাজ করতে পরিবার পরিজন নিয়ে রওনা দিচ্ছেন। ইট ভাটার শ্রমিকরা জানান, নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ইট বানানোর কাজ করতে হয় তাদের। ভাটায় কাজ করতে যেতে হয় সর্দারের মাধ্যমে চুক্তিতে। পুরো ৬ মাসের জন্য সর্দারই শ্রমিকের সঙ্গে চুক্তি করেন। কাজ শুরু হওয়ার আগে সর্দার কিছু টাকা অগ্রীম দিয়ে শ্রমিককে দাদন দিয়ে রাখেন। প্রতিদিন ১৬-১৭ ঘন্টা কাজ করেতে হয়। ইট বানানোর কারিগরদের দেওয়া হয় সবচেয়ে বেশি টাকা, ৬ মাসের জন্য কারিগর ১ লাখ, জোগালি ৪৫ হাজার, আগাটক ৮০ থেকে ৯০ হাজার, গোড়ারটক ৭০ থেকে ৮০ হাজার এবং মাটি বহনকারী ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন। আবার প্রতিদিন কাজ শেষে দেওয়া হয় খোরাকি। সাতদিনে এই খোরাকি জনপ্রতি শ্রমিকরা পান ৩শত থেকে ৫শত টাকা করে।
এলাকায় কাজের অভাবে পাইকগাছা থেকে শ্রমিকরা কাজের জন্য দেশের বিভিন্ন জেলার ইট ভাটায় রওনা দিচ্ছে। বর্তমানে পণ্যের মূল্য ক্রমাগত বাড়ছে, ফলে নিম্ন আয়ের জনগণকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নিজ এলাকায় কাজের অভাব ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ফলে নিম্ন আয়ের মানুষ ছাড়াও মধ্যবিত্তরাও তাদের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। সংসারের খরচ বহন করতে ইটভাটায় অমানবিক শারীরিক-মানসিক নির্যাতন সয়ে কাজ করতে হয় শ্রমিকদের। অভাবের তাড়নায় তারা বাধ্য হয়ে ইটভাটায় ইট পোড়ানো ভাটা শ্রমিকের কাজ করেন।
শ্রমিকরা জানান, দুই শিফটে কাজ করতে হয় তাদের। ফজরের আযানের পর পরই শুরু হয় তাদের কর্মজীবন। চলে দুপুর পর্যন্ত। সামান্য বিরতি দিয়ে সন্ধ্যা ৭-৮ টা পর্যন্ত তাদের কাজ চলে। তাদের মাঝে ভাগ করে কয়েকজন দিনে কয়েকঘন্টা বিশ্রামের সুযোগ পান। বিনিময়ে তাদের কাজ চলে সারা রাত। ভাটার পাশেই টিনের ঘর তুলে তাদের থাকার ব্যবস্থা করেন ভাটা মালিক। সেখানে শ্রমিকরা থাকেন ও রান্না করে খাবারের ব্যবস্থা করেন।
ইটভাটার শ্রমিকদের জীবনযাত্রা অত্যন্ত কষ্টকর। তারা অস্থায়ী ঝুপড়ি ঘরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করেন এবং দীর্ঘ সময় ধোঁয়া ও ধুলোবালির মধ্যে কাজ করার ফলে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। বিশেষ করে শ্রমিকদের সাথে যাওয়া শিশুরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়।
https://www.kaabait.com