সারাদেশের ন্যায় আমাদের সাতক্ষীরার মাটিতে যে মানুষগুলো স্বাধীন দেশের নাগরিক বলে গর্ববোধ করেন, দেশের বুকে লাল সবুজের যে জাতীয় পতাকাগুলো পতপত করে উড়ে সেই দেশটির নাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। বুকভরে আমরা যাকে আমার দেশের নাম কিম্বা আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ বলি তা কিন্তু অতি সহজে অর্জিত হয়নি। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম আর নয় মাসব্যাপি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল। নয় মাসব্যাপী পাকিস্তানী খানসেনা ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধ ও গেরিলা যুদ্ধ করেছিল মুক্তিযোদ্ধারা, মুক্তিকামী নির্ভীক বাঙালিরা এই নয় মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে মাতৃভূমি রক্ষায় প্রাণ দিয়ে লক্ষ বাঙালি শহীদ হয়েছেন। নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল অসংখ্য মানুষকে, খান সেনা ও তাদের দোসররা লক্ষ লক্ষ বাঙালি মা-বোনদের ইজ্জত লুট করেছিল, আগুনে পুড়িয়ে মেরেছিল যেমন মুক্তিকামী মানুষকে তেমনি ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে ছাই করেছিল। কিন্তু মুক্তিপাগল সাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের এবং মুক্তিকামী মানুষের কাছে ওরা পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পন করেছিল। অবশেষে তাদের রক্তের বিনিময়ে হলুদ রঙের বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত সবুজের মাঝে লাল সূর্যের লক্ষ-কোটি পতাকা উড়ল স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে। কীভাবে কেটেছে ৯ মাস যুদ্ধকালে তা শুনলে হতবাক হতে হয়। সারা দেশজুড়ে এ যুদ্ধ হয়েছিল।
দেশের সর্ব দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত আমাদের সাতক্ষীরা জেলা। এই সাতক্ষীরা জেলার দক্ষিণে সুন্দরবন এবং সাগর সীমান্তে দক্ষিণ তালপট্টির প্রান্ত ছুঁয়ে রায়মঙ্গল নদী আন্তর্জাতিক সীমানা ধরে জেলার পশ্চিমে ভারত সীমান্ত। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধের সময় সাতক্ষীরা জেলা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলা। দেশের ভেতর থেকে বহু মানুষ ছুটে গেছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। সাতক্ষীরা জেলার সীমান্ত পেরিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে দেশের মধ্যে ঢুকে পাক হানাদারদের সাথে যুদ্ধ করেছে। এ কারণে যুদ্ধকালীন সময়কালটা সাতক্ষীরা জেলার জন্য ছিল অত্যন্ত ঘটনাবহুল। দেশের ভেতর থেকে ৫ মুক্তিপাগল ছাত্র (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মতান্তরে খুলনা বিএল কলেজ) জেলার কলারোয়া থানার সীমান্ত পার হতে যেয়ে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে। এর মধ্যে ২ জন পালিয়ে যেতে পারলেও ৩ জনকে ধরে কলারোয়া থানায় নিয়ে যায়। পরে ঐ ৩ জনকে থানার পেছনে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে।
উল্লেখ্য এর মধ্যে ২ জন তাৎক্ষণিক মারা না গেলেও মাটি খুঁড়ে তাদেরকে জীবন্ত কবর দেয়া হয়। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আবাদেরহাট এলাকার শিয়ালডাঙ্গা গ্রামের জনৈক ব্যক্তিকে মাটি খুঁড়তে বলে খানসেনারা। অপরাধ কী সে জানে না। শুধু মুক্তি হ্যায়-সন্দেহে তাকে তারই খোড়া ঐ কবরে শুইয়ে জীবন্ত কবর দেয়। কালিগঞ্জ থানাধীন পোদালী চাঁদখালীর ধ্রুব মিস্ত্রী ওরফে পাগল ডাক্তারকে ধরে কাকশিয়ালী নদীর চরে অর্ধেকটা পুঁতে ইট-পাথর মেরে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে খানসেনারা তাকে হত্যা করে। এ রকম লোমহর্ষক অনেক ঘটনা জানা অজানায় রয়ে গেছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ব্যাপক ও জোরদার করতে ১১টি রণাঙ্গণে বা সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিল। প্রতিটি সেক্টরে একজন করে সেক্টর কমান্ডার ছিল। প্রবাসী সরকার থেকে প্রথমে যে ১০টি সেক্টর করা হয়ে তার মধ্যে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত জুড়ে সাতক্ষীরা জেলার ৩ টি সেক্টর-এর আওতাধীণ ছিল। মূল জেলা শহরসহ পার্শ্ববর্তী দক্ষিণে সুন্দরবন এলাকা ৯ নং এবং শহরের গা ঘেষে উত্তরাংশে সাতক্ষীরা সদর ও কলারোয়া থানা এলাকা ৮ নং ও জেলার দক্ষিণে সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগর-এ মোহনা জুড়ে ছিল ১০ নং নৌ মুক্তিবাহিনী (নৌ কমান্ডো) সেক্টর।
শ্যামনগর: সাতক্ষীরার দক্ষিণাঞ্চল আশাশুনি ও শ্যামনগর দুটি থানা সুন্দরবন সংলগ্ন এবং নদী-খাল বেষ্টিত থাকায় এখনকার যুবকরা নদী ও পানি দেখে উৎফুল্ল হয় এবং সাঁতারে পটু থাকায় অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এ নৌ কমান্ডে নাম লেখায় ও যোগ্যতায় উত্তীর্ণ হয়। দীর্ঘ প্রশিক্ষণ ও বাছাইতে ৪০ হাজারের মধ্যে মাত্র যে ৬০ জনকে প্রাথমিক পর্বে নির্বাচিত করা হয় তার অধিকাংশই সাতক্ষীরা জেলার। এ গর্ব সাতক্ষীরাবাসির। শুধু এ কারণে গর্ব নয়। একাত্তরের ১৪ আগস্ট মংলা বন্দরে ঐতিহাসিক ও বিস্ময়কর যে অপারেশন করা হয় তা ছিল অতীব লোমহর্ষক ঘটনা।
জাহাজ ধ্বংসকারী মাইন হাতে নিয়ে নৌ কমান্ডোর সাহসী মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় ২ মাইল বড় নদী ডুব দিয়ে দিয়ে অতি সতর্কতার সাথে ৯ টি জাহাজের কাছে যায়। এর পর দ্রুত ফিরে আসার মুহূর্তে প্রচন্ড বিস্ফোরণে ৯ টি জাহাজ ধ্বংস হয়ে বন্দরের বুকে ডুবে যায়। শুধু দেশের মানুষ নয়, সারা বিশ্বের মানুষ এ অপারেশনের কথা শুনে অবাক হয়ে যায়। এ অপারেশন শেষ করে সাতক্ষীরার সীমান্ত পথে ভারতের হাসনাবাদ ফেরার আগে একটি ফরেস্ট অফিস ঘেরাও করে তারা ২ টি লঞ্চসহ বহু মালামাল নিয়ে যায়। এতে সন্তুষ্ট হয়ে মেজর এম এ জলিল তাদেরকে অভ্যর্থনা জানান। পরে তাদেরকে বাংলাদেশ মিশনে নিয়ে গেলে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানী সকলকে মিষ্টি খাওয়ান এবং ১০০ টাকা উপহার দেন। এর পরদিন রাতে শ্যামনগর থানার শেখ মোহর আলী ও আবু নেছার সিদ্দিকীকে এবং সাতক্ষীরা শহরের মীর মোস্তাক আহমদে রবিকে সিলেট অপারেশনে যেতে দমদম বিমান বন্দরে এম এ জি ওসমানী বিদায় দেন। সাতক্ষীরার ৩ জন মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধকালীন সময়ের এ সংবর্ধনা ইতিহাসের পাতায় চির অম্লান। সাতক্ষীরাবাসি গর্বিত।
১৯৭১এর ৬ মে সুন্দরবনের কোল ঘেসে যাওয়া খোলপেটুয়া নদীতে ৯নং সেক্টরের বহু কমান্ডার ও মুক্তিযোদ্ধার একটি দল মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র যোগাতে ভারত যেয়ে অস্ত্র বোঝাই করে নিয়ে আসার পর রাজাকার ও পিচ কমিটির সহায়তায় খানসেনাদের খবর দেয়। পরে খানসেনারা গান বোট নিয়ে এসে অতর্কিত হামলা চালিয়ে লঞ্চটি ডুবিয়ে দেয়। এলাকাটি হচ্ছে শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের পারশেমারী। এতে ৯নং সেক্টর কমান্ডার এম এ জলিল ও ক্যাপ্টেন তোফাজ্জেলসহ প্রায় ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা অচেনা শ্যামনগরের গাবুরায় ঢুকে পড়ে এবং হতবিহ্বাল হয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে থাকে। খান সেনাদের দোসর স্থানীয় সোহরাব হাজীর হাতে এম এ জলিলসহ কয়েকজন ধরা পড়ে।
https://www.kaabait.com