• রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৮:৩১
সর্বশেষ :
উপজেলায় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন তালার শেখ ইয়াসিন আলী সাতক্ষীরা সদরে অদম্য নারী পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত পাঁচ নারীর আত্মকথা শ্যামনগরে এডিস মশা নির্মূলে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা অভিযান বেতনা ও মরিচ্চাপ নদী রক্ষায় টিআরএম বাস্তবায়নের দাবিতে সাতক্ষীরায় মানববন্ধন ঈদকে ঘিরে দেবহাটার দর্জিদের ব্যস্ততা, রাত জেগে চলছে পোশাক তৈরির কাজ মির্জা আব্বাসের কিছু হলে তার ৮০ পারসেন্ট দায়ী পাটওয়ারীর অনিয়ন্ত্রিত কথাবার্তা : মেঘনা আলম শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পথে ট্রাকের ধা*ক্কায় প্রা*ণ গেল যুবক ফরহাদ সরদারের দেবহাটায় র‍্যাব-৬ এর অভিযানে তক্ষকসহ আ*টক ১, থানায় মাম*লা মির্জা আব্বাসের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী হাতের মেহেদীর রং শুকানোর আগেই বিধবা হলো সদ্য বিবাহিত গৃহবধূ তানিয়া খাতুন

সাতক্ষীরা সদরে অদম্য নারী পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত পাঁচ নারীর আত্মকথা

গাজী জাহিদুর রহমান জাহিদ / ১২ দেখেছেন:
পাবলিশ: রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬

সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় সমাজ ও পরিবারের নানা বাধা অতিক্রম করে জীবন সংগ্রামে সাফল্য অর্জন করেছেন পাঁচ নারী। তৃণমূল থেকে উঠে আসা এসব সংগ্রামী নারীদের খুঁজে বের করে “অদম্য নারী পুরস্কার–২০২৫” এর জন্য পাঁচটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে মনোনীত করেছে উপজেলা প্রশাসন। প্রত্যেকের জীবনেই রয়েছে অনন্য সাহস, আত্মশক্তি ও সংগ্রামের অনুপ্রেরণামূলক গল্প।

 

নিচে তাদের জীবনের সংক্ষিপ্ত গল্প তুলে ধরা হলো

অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী রায়হাতুল জান্নাত রিমি

জীবনের কঠিন বাস্তবতা জয় করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন রায়হাতুল জান্নাত রিমি। তিনি সাতক্ষীরা সদরের কাটিয়া লস্করপাড়া এলাকার মো. মিজানুর রহমান ও মোছা. শাহানারা বেগমের কন্যা। অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাল্যবিবাহের শিকার হন তিনি। স্বামী নিজেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার পরিচয় দিয়ে নানা প্রলোভন দেখালেও পরে প্রতারণার শিকার হন রিমি ও তার পরিবার।

এরই মধ্যে একটি কন্যা সন্তানের জন্মের সময় ব্রেইন স্ট্রোকের কারণে তার শরীরের বাম পাশ অবশ হয়ে যায়। পরে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে। জীবনের সেই কঠিন সময়েও তিনি থেমে থাকেননি। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় সাতক্ষীরা জেলায় প্রথম হন।

পরে হস্তশিল্প ও বিউটি পার্লারের প্রশিক্ষণ নেন। দ্বিতীয়বার বিয়ে হলেও সেটিও টেকেনি। এরপর নিজের চেষ্টায় পার্লার ও বুটিক্স ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে সাতক্ষীরা শহরের নারিকেলতলা মোড়ে তার পার্লার রয়েছে। অনলাইনে পোশাক, কসমেটিকস ও জুয়েলারি বিক্রি করে মাসে উল্লেখযোগ্য আয় করছেন তিনি।

এছাড়া হাঁস-মুরগির খামার, স্ট্রিট ফুড স্টলসহ বিভিন্ন উদ্যোগ পরিচালনা করছেন। তিনি পৌরসভা নারী সুরক্ষা ফোরামের সেক্রেটারির দায়িত্বও পালন করছেন। এক সময়ের সংগ্রামী রিমি এখন সন্তানদের নিয়ে স্বাবলম্বী ও সম্মানজনক জীবনযাপন করছেন।

শিক্ষা ও চাকরিক্ষেত্রে সফল নারী গুলশান আরা বেগম
শিক্ষা ও চাকরিক্ষেত্রে সাফল্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গুলশান আরা বেগম। তিনি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বাগানবাড়ি গ্রামের শেখ মিজানুর রহমানের কন্যা।

ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিলেন তিনি। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে বৃত্তি লাভ করেন এবং এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনার মাঝেই বিয়ে হয়ে যায় তার। শ্বশুরবাড়ির দায়িত্ব সামলিয়েও তিনি থেমে থাকেননি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

২০০০ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে সি-ইন-এড ও বি-এড ডিগ্রি অর্জন করেন। করোনা মহামারির সময় অনলাইন পাঠদান, গুগল মিট ব্যবহার এবং ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তিনি শিশুদের সৃজনশীলতা বিকাশে আবৃত্তি, অভিনয়, বিতর্ক, বিজ্ঞানচর্চা ও প্রযুক্তি শিক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখছেন। তার রচিত দুটি কাব্যগ্রন্থ— অনাগত সন্ধ্যার পদধ্বনি ও শিলাখণ্ড সাজায় নতুন স্বপ্ন। এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে তার গবেষণাধর্মী গ্রন্থ আমার প্রাথমিক শিক্ষা ভাবনা প্রকাশিত হয়েছে।

২০২৩ সালে সাতক্ষীরা জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষিকা এবং ২০২৪ সালে খুলনা বিভাগের শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক নির্বাচিত হন তিনি।

সফল জননী লুৎফুন নেছা বেগম
লুৎফুন নেছা বেগম একজন অনুপ্রেরণাদায়ী মা, যিনি প্রতিকূলতার মধ্যেও সন্তানদের সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। মাত্র দুই বছর বয়সে মাকে হারিয়ে সৎমায়ের নির্যাতনের মধ্যে বড় হন তিনি। সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীন বাল্যবিবাহ হয় তার। শ্বশুরবাড়িতে শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। স্বামীর পরিবারে সাত ভাইবোনের দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে।

অভাব-অনটনের মাঝেও সন্তানদের শিক্ষার জন্য তিনি গরু, হাঁস-মুরগি ও কবুতর পালন, সেলাই কাজসহ বিভিন্ন কাজ করেন। সন্তানদের পাশে বসে তাদের পড়াশোনায় উৎসাহ দেন।

তার অক্লান্ত পরিশ্রম ও মমতার ফলে আজ তার সব সন্তান উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত। সংগ্রামের মধ্যেও সন্তানদের সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলে তিনি একজন সফল জননী হিসেবে সমাজে অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছেন।

 

নির্যাতিতা থেকে স্বাবলম্বী নারী খুকুমনি
দুই সন্তানের জননী খুকুমনি জীবনের ভয়াবহ নির্যাতন পেরিয়ে আজ স্বাবলম্বী হওয়ার পথে হাঁটছেন। বিয়ের পর আর্থিক সংকটের কারণে এক দালালের মাধ্যমে তাকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। সেখানে তাকে এক সৌদি পরিবারের কাছে গৃহকর্মী হিসেবে বিক্রি করা হয়। নির্যাতন, অবরুদ্ধ জীবন ও অমানবিক আচরণের শিকার হন তিনি।

অবশেষে এক বাঙালির সহায়তায় সৌদি পুলিশের মাধ্যমে উদ্ধার হন। পরে চিকিৎসা ও বেতনসহ তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। দেশে ফিরে দালালচক্রের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেন তিনি।

বর্তমানে খুকুমনি বাড়িতে পোল্ট্রি খামার করেছেন। পাশাপাশি হোমমেড কেক, বিস্কুট ও আচার তৈরি করে বিক্রি করছেন। ভবিষ্যতে বড় কৃষি খামার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

 

সমাজ উন্নয়নে অবদান রাখা মোহিনী পারভীন
সমাজ উন্নয়ন ও মানবিক কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় অদম্য নারী পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন মোহিনী পারভীন। তিনি সাতক্ষীরা সদরের মধ্যকাটিয়া মিলবাজার এলাকার বাসিন্দা।

একজন সচেতন সমাজকর্মী হিসেবে তিনি এলাকায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মেধাবী শিক্ষার্থীদের উৎসাহ প্রদান, পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।

তিনি বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ সহায়তা প্রদান, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং মানব পাচার প্রতিরোধে কাজ করছেন। যুবসমাজকে মাদকমুক্ত রাখতে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
সমাজ উন্নয়ন, মানবিকতা ও নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি এলাকায় ইতোমধ্যেই একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।


এই বিভাগের আরো খবর

https://www.kaabait.com