সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বিজয় কুমার জোয়ার্দারের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন তার স্ত্রী মুক্তি সরকার (৩৫)। বুধবার (৪ মার্চ) আশাশুনি থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (সংশোধনী-২০০৩) এর ১১(গ)/৩০ ধারা এবং দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ৩১৩ ও ৫০৬ ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, মামলার প্রধান আসামি আশাশুনি উপজেলার ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বিজয় কুমার জোয়ার্দার (৩৭)। তিনি মাগুরা জেলার শ্রীপুর থানার ছোনগাছা গ্রামের পরিমল কুমার জোয়ার্দারের ছেলে। মামলায় আরও আসামি করা হয়েছে বিজয়ের কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী ফাগুনী সুমি কাসারী (প্রায় ২৫), মা উষা রাণী জোয়ার্দার (৬৫), বাবা পরিমল কুমার জোয়ার্দার (৭০) এবং ভাই পরিতোষ কুমার জোয়ার্দারকে (৩২)।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল কোর্টের মাধ্যমে বিজয় কুমার জোয়ার্দারের সঙ্গে মুক্তি সরকারের বিয়ে হয়। পরে ২০২২ সালের ৮ অক্টোবর হিন্দু রীতিনীতি অনুযায়ী পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের সময় দুজনই পড়াশোনা করতেন।
অভিযোগে বলা হয়, বিজয় কুমার জোয়ার্দার একটি দরিদ্র জেলে পরিবারের সন্তান হওয়ায় বিয়ের পর সংসারের অধিকাংশ খরচ বহন করতেন মুক্তি সরকার। তিনি তার উপার্জিত অর্থ স্বামীর হাতে তুলে দিতেন। স্বামীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুক্তির পরিবার থেকে যৌতুক হিসেবে স্বর্ণালংকার (দুটি আংটি ও একটি গলার চেইন), একটি টিভি, একটি ফ্রিজসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র দেওয়া হয়, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৬ লাখ টাকা। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে আর্থিক সহায়তাও করা হয়।
তবে অভিযোগ রয়েছে, এরপরও বিজয় কুমার জোয়ার্দার তার গ্রামের বাড়িতে ঘর নির্মাণের জন্য মুক্তির পরিবারের কাছে ৫০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। এ টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তিনি বিভিন্ন সময়ে স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, সংসার চলাকালে মুক্তি সরকার গর্ভবতী হলে বিজয় কুমার জোয়ার্দার সন্তান নিতে রাজি হননি। তিনি বিভিন্নভাবে গর্ভপাত করানোর জন্য চাপ দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে মুক্তির অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্থানীয় চিকিৎসকের মাধ্যমে তার গর্ভপাত করানো হয়। পরবর্তীতেও কয়েকবার একইভাবে গর্ভের সন্তান নষ্ট করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে করে মুক্তি সরকার বর্তমানে সন্তান ধারণে জটিলতার সম্মুখীন হন।
পরবর্তীতে সন্তান ধারণের চিকিৎসার জন্য স্বামীর পরামর্শে মুক্তি সরকার ভারতের চেন্নাইয়ে চিকিৎসা নিতে যান। তবে সেখানে যাওয়ার কথা থাকলেও বিজয় কুমার জোয়ার্দার নানা অজুহাতে চেন্নাই যাননি এবং স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগও বন্ধ করে দেন। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে তিনি স্ত্রীর ফোনও রিসিভ করেননি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে মোবাইল ফোনে দীর্ঘ সময় কথা বলার বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হলে মুক্তি জানতে পারেন, তার স্বামী ফাগুনী সুমি কাসারী নামে এক নারীর সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িত। সম্প্রতি তাকে না জানিয়ে ওই নারীকে বিয়ে করেছেন বলেও তিনি জানতে পারেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, গত ১৯ ফেব্রুয়ারি রাত ৩টার দিকে ফাগুনী সুমি কাসারী মোবাইল ফোনে মুক্তিকে জানায় যে বিজয় কুমার জোয়ার্দার তার স্বামী এবং তাকে বিজয়কে ছেড়ে চলে যেতে বলে। এ সময় প্রতিবাদ করলে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি মুক্তি সরকার চেন্নাই থেকে দেশে ফিরে আশাশুনি সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর সরকারি বাসভবনে অবস্থান নেন। সেখানে আবারও তাকে ৫০ লাখ টাকা যৌতুকের দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টার দিকে বিজয় কুমার জোয়ার্দার মুক্তির বাম চোখসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে কিল-ঘুষি মারেন এবং তাকে গুরুতর জখম করেন। এমনকি হত্যার উদ্দেশ্যে গলা চেপে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
তার চিৎকারে পাশের মানিকখালি গ্রামের রিপন মন্ডল (৩৮), নাইটগার্ড মামুন হোসেন (২৮), আনন্দ সরকার (৬৬) ও ডিউটিরত আনসার সদস্যরা এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় মুক্তি সরকারকে আশাশুনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
এ ঘটনায় আশাশুনি থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানা যায়।
https://www.kaabait.com