সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলায় উঠতি বয়সী কিশোর ও তরুণদের মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবক ও সচেতন মহলে। অনেক পরিবারের দাবি, বয়সে ছোট ছেলেদের একটি অংশ ধীরে ধীরে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। সন্তানদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে গিয়ে অনেক অভিভাবক অসহায় হয়ে পড়েছেন বলেও জানিয়েছেন।
কয়েকজন অভিভাবক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমাদের ছোট ছোট ছেলেরা যেভাবে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে, আমরা অভিভাবকরা তাদের ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছি। একপর্যায়ে তারা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, আপনারা কঠোরভাবে ব্যবস্থা নিন।”
অভিভাবকদের অভিযোগ, উঠতি বয়সী ছেলেদের একটি অংশ সন্ধ্যার পর বাড়ির বাইরে অবস্থান করে। তারা কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে কিংবা কী ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে—অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের সদস্যরা তা জানতে পারছেন না। ফলে সন্তানদের মাদকের মতো ভয়াবহ আসক্তি থেকে দূরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে তাদের ভাষ্য।
সচেতন মহল বলছে, কিশোর বয়সে মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ততা শুধু একটি পরিবারের সমস্যা নয়; এটি ধীরে ধীরে সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলার সমস্যায় রূপ নিতে পারে। তাই মাদকের বিস্তার রোধে প্রশাসনের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে একযোগে কাজ করতে হবে।
মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান
এদিকে দেবহাটা থানার অফিসার ইনচার্জ এইচএম শাহীন জানিয়েছেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে সক্রিয় রয়েছে। মাদক সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তা দ্রুত পুলিশকে জানানোর জন্য স্থানীয়দের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো এলাকায় মাদক বিক্রি, সরবরাহ বা সেবনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানালে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ হবে।
সন্তানদের প্রতি অভিভাবকদের আরও নজরদারির আহ্বান
পুলিশ ও স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা অভিভাবকদেরও আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কখন বাড়ি ফিরছে এবং তার চলাফেরায় কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের খোঁজ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অভিভাবকদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, সন্তানকে শুধু শাসন নয়, তার বন্ধু-বান্ধব, চলাফেরা ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে খোঁজ নেওয়া জরুরি। সন্তানদের খেলাধুলা, পড়াশোনা, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নির্জন এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর দাবি
স্থানীয়দের ভাষ্য, সন্ধ্যার পর বিভিন্ন নির্জন স্থান ও জনসমাগম কম এমন এলাকায় তরুণদের আড্ডা নিয়ে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। এসব স্থানে সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড চোখে পড়লে স্থানীয়দের তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
তাদের মতে, মাদক প্রতিরোধে শুধু মাদকসেবীকে আটক করাই যথেষ্ট নয়; মাদকের উৎস, সরবরাহ ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
‘যেখানেই মাদক, সেখানেই প্রতিরোধ’
দেবহাটা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। প্রশাসন ও পুলিশের পাশাপাশি অভিভাবক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেবহাটাকে মাদক, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও বাল্যবিবাহমুক্ত করতে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, উঠতি বয়সী কিশোর-তরুণদের মাদকের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে প্রশাসন ও পুলিশের নজরদারি আরও জোরদার হবে। পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারও সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল ও সচেতন ভূমিকা পালন করবে।
সচেতন মহলের আহ্বান—মাদকের বিরুদ্ধে শুধু অভিযোগ নয়, পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। যেখানেই মাদকের সন্ধান মিলবে, সেখানেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে।
https://www.kaabait.com