মানবসেবাই যার ব্রত, চিকিৎসাসেবাই যার নেশা। অর্থের অভাবে যেন কোনো মানুষ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন, সেই প্রত্যয় নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন সাতক্ষীরার মানবিক চিকিৎসক ডা. বলরাম বিশ্বাস। নিজ খরচে ওষুধ সরবরাহসহ গরিব, অসহায়, দুস্থ, বৃদ্ধ, এতিম ও প্রতিবন্ধীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসাসেবা দিয়ে মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। ইতোমধ্যে প্রায় ১০ হাজার প্রতিবন্ধী মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
ডা. বলরাম বিশ্বাস সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার শ্বেতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। চিকিৎসা পেশায় যুক্ত হওয়ার পর থেকেই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে জীবনের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন তিনি। সাদা মনের মানুষ হিসেবে পরিচিত এই চিকিৎসক এলাকায় ‘গরিবের ডাক্তার’ নামেও পরিচিতি পেয়েছেন।
চিকিৎসাসেবাকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে তিনি রোগীদের কাছ থেকে নামমাত্র ফি নিয়ে থাকেন। প্রথমে ৩০০ টাকা এবং পরবর্তীতে ২০০ টাকা ফি নির্ধারণ করেছেন। তবে ৭০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক ব্যক্তি ও হতদরিদ্র মানুষের কাছ থেকে কোনো ফি নেন না। বিধবা, এতিম, অসহায় ও দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রদান করেন।
বিশেষ করে জন্মগতভাবে প্রতিবন্ধী ও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য রয়েছে তাঁর বিশেষ উদ্যোগ। যেসব প্রতিবন্ধী রোগী শারীরিক অসুস্থতার কারণে চেম্বারে আসতে পারেন না, তাঁদের চিকিৎসার জন্য প্রতি রোববার নিজেই বাড়ি বাড়ি ছুটে যান তিনি। শুধু তাই নয়, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত অসহায় ব্যক্তিদেরও বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকেন। জরুরি রোগীদের জন্য অ্যাম্বুলেন্সে বিনামূল্যে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থাও করে আসছেন।
চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি এলাকার তরুণ ও যুবসমাজকে খেলাধুলায় উৎসাহিত করতে প্রায় ১৮ থেকে ২০ বছর ধরে প্রতিবছর ফুটবল ও ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করে আসছেন তিনি। এসব আয়োজনের বড় অংশের ব্যয় নিজেই বহন করেন। শিক্ষার প্রতিও রয়েছে তাঁর বিশেষ আগ্রহ। প্রায় ২০ বছর ধরে দ্বিতীয় থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি শ্রেণির প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন।
ডা. বলরাম বিশ্বাস ২০০২ সালে ঢাকায় চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ২০০৫ সাল থেকে সাত বছর গণস্বাস্থ্য সেবা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে মেডিকেল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সাল থেকে প্রতি ইংরেজি মাসের প্রথম সপ্তাহে নিজ এলাকায় রোগী দেখা শুরু করেন। পরবর্তীতে মায়ের অসুস্থতার কারণে চাকরি ছেড়ে এলাকায় অবস্থান করেন। বর্তমানে প্রতি মাসের শেষ পাঁচ দিন ঢাকায় নিজের চেম্বারে রোগী দেখেন।
মানবিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ছাত্রজীবন থেকেই সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৯৮-৯৯ সালে ঢাকার সিটিং সার্ভিস বাসের পেছনে ‘একটি ভুল সারা জীবনের কান্না’ স্লোগানটি প্রায় এক হাজার বাসে নিজ হাতে রং-তুলির আঁচড়ে লিখে দেন। গাবতলী, সায়েদাবাদ, ডেমরা, গুলিস্তান, মতিঝিল ও ফার্মগেটসহ বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাসগুলোতে তাঁর এই সচেতনতামূলক প্রচারণা ছড়িয়ে পড়ে।
এ ছাড়া আশাশুনি ও বুধহাটা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
চিকিৎসা, শিক্ষা, খেলাধুলা ও সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন ডা. বলরাম বিশ্বাস। নিজের সামর্থ্য দিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। মানবিক চিকিৎসাসেবার এমন দৃষ্টান্ত সমাজের অন্যদেরও মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
https://www.kaabait.com