কবিতা যখন কেবল ব্যক্তিমানুষের অনুভবের আয়না নয়, হয়ে ওঠে একটি জাতির ইতিহাস, আত্মপরিচয় ও অস্তিত্বের ভাষা—তখন সেই কবিতার ভুবনে উচ্চারিত হয় কিছু অনন্য নাম। বাংলা সাহিত্যে মুহম্মদ নূরুল হুদা তেমনই এক স্বতন্ত্র কণ্ঠ। ‘জাতিসত্তার কবি’ হিসেবে যাঁর পরিচিতি আজ বাংলা কবিতার পরিসরে সুপ্রতিষ্ঠিত।
৩০ সেপ্টেম্বর বুধবার, কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার জন্মদিবস। ১৯৪৯ সালের এই দিনে কক্সবাজারের পোকখালী গ্রামে জন্ম নেওয়া কবি তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রায় বাঙালির শেকড়, ইতিহাস, ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার অনুসন্ধানকে কবিতার অন্যতম প্রধান বিষয় করে তুলেছেন।
তাঁর কবিতায় ব্যক্তিমানুষের প্রেম-বিরহ যেমন আছে, তেমনি আছে মাটি ও মানুষের প্রতি গভীর দায়বোধ। আছে নদী, সমুদ্র, পাহাড়, জনপদ ও লোকজ জীবনের অনুষঙ্গ। ইতিহাসের গভীর থেকে উঠে আসা বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন তাঁর কবিতায় নতুন তাৎপর্য পেয়েছে।
মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতার একটি বড় শক্তি তাঁর শেকড়সন্ধানী দৃষ্টি। তিনি কেবল বর্তমানকে দেখেননি; বর্তমানের ভেতর দিয়ে খুঁজেছেন অতীতের পথ, জাতির স্মৃতি ও সভ্যতার ধারাবাহিকতা। ফলে তাঁর কবিতায় ব্যক্তির পাশাপাশি উপস্থিত হয়েছে বৃহত্তর ‘আমরা’—একটি জনগোষ্ঠী, একটি ভূখণ্ড এবং একটি জাতির আত্মপরিচয়।
‘শোণিতে সমুদ্রপাত’, ‘আমরা তামাটে জাতি’, ‘জন্মজাতি’, ‘মৈনপাহাড়’ ও ‘শোভাযাত্রা দ্রাবিড়ার প্রতি’সহ তাঁর নানা সৃষ্টিতে ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, লোকজ জীবন ও সাংস্কৃতিক চেতনার যে মেলবন্ধন দেখা যায়, তা বাংলা কবিতায় তাঁকে একটি স্বতন্ত্র আসন দিয়েছে।
তাঁর সাহিত্যকর্মের বিস্তার শুধু কবিতায় সীমাবদ্ধ নয়। কথাসাহিত্য, প্রবন্ধ, গবেষণা, অনুবাদ ও লোকসংস্কৃতি নিয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ করেও তাঁর সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে মানুষ, মাটি এবং এই ভূখণ্ডের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাস।
একজন কবির সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর সৃষ্টি। সময়ের স্রোত পেরিয়ে যে কবিতা পাঠকের কাছে ফিরে আসে, নতুন প্রজন্মকে নিজের শেকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়—সেই কবিতাই শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে উত্তরাধিকার। মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতার ভুবনও তেমন এক উত্তরাধিকারের নাম।
তিনি ১৯৫৯ সালে পূর্ব পোকখালী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে মেধা-বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৫৯ সালে ঈদগাঁও হাইস্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৬৫ সালে ঈদগাঁও হাইস্কুল থেকে এসএসসি (মাধ্যমিক) পরীক্ষায় (কলা বিভাগে) কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন তিনি। তিনি ১৯৬৭ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে অনার্স ও পরের বছর মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন।
কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা কবিতার পাশাপাশি লিখেছেন গদ্য, করেছেন অনুবাদ, লিখেছেন চিকিৎসা শাস্ত্র (হোমিওপ্যাথিক) নিয়ে। বাংলাভাষার পাশাপাশি ইংরেজিতেও লিখেছেন তিনি।
তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। ১৯৮৮ সালে বাংলা কবিতায় উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য তাকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ২০১৫ সালে একুশে পদক প্রদান করা হয়। এ ছাড়া তিনি বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
তাঁর জন্মদিনে তাই শুধু একজন কবিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো নয়; বরং বাংলা কবিতায় তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যসাধনা, জাতিসত্তার অনুসন্ধান এবং বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা।
https://www.kaabait.com