• বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৫০
সর্বশেষ :
দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হার্ট অ্যাটাকের রোগীকে স্ট্রেপ্টোকাইনেজ ইনজেকশন প্রদান কর্মী থেকে উদ্যোক্তা: আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহের সফলতার গল্প তালায় সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, বাতিলের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন শ্যামনগরে বাসের ধাক্কায় ভ্যান চালকের মৃ*ত্যু শ্যামনগরে নক্ষত্রের অভিবাদন ১০ গুণী ব্যক্তিকে সংবর্ধনা ফিংড়ীর বেনীয়াখালীতে পৈতৃক জমি জবর দখলসহ গাছ কর্তনের অভিযোগ বিএফআরআই এর ডিজির লোনাপানি কেন্দ্রের গবেষণা কার্যক্রম পরিদর্শন দেবহাটায় ১৬৯ বোতল উইনকেরেক্সসহ আটক ১ এইচএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে চিরকুট লিখে শিক্ষার্থীর আ/ত্ম/হ/ত্যা শ্যামনগরে ফেন্সিডিল ও ভারতীয় ওষুধ জব্দ করল কোস্ট গার্ড

কর্মী থেকে উদ্যোক্তা: আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহের সফলতার গল্প

জিএম আমিনুল হক / ২১ দেখেছেন:
পাবলিশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬

🖼️ ফটো কার্ড তৈরি করুন

সফলতা কখনো হঠাৎ করে আসে না। তার পেছনে থাকে পরিশ্রম, ধৈর্য, সততা আর মানুষের প্রতি ভালোবাসা। এমনই এক সফল মানুষের গল্প আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহের জীবন। একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে তিনি আজ একটি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর এই পথচলা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং পরিশ্রমী মানুষের জন্য একটি অনুপ্রেরণাও।

 

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ব্রহ্মরাজপুর ইউনিয়নের নুনগোলা গ্রামের বাসিন্দা আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ আজ এলাকায় সদা হাস্যজ্জ্বল, সাদা মনের একজন গুণী মানুষ হিসেবে পরিচিত। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, ছোট পদ থেকে শুরু করেও বড় স্বপ্ন দেখা যায় এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়, যদি লক্ষ্য স্থির থাকে এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠা থাকে।

 

আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহের কর্মজীবনের শুরুটা ছিল এসিআই কোম্পানিতে। সেখানে তিনি এসআর পদে কাজ শুরু করেন। এসআর অর্থাৎ বিক্রয় প্রতিনিধির কাজ মাঠপর্যায়ের কাজ। এই কাজে প্রতিদিন মানুষের কাছে যেতে হয়, তাদের কথা শুনতে হয়, তাদের প্রয়োজন বুঝতে হয়। এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যায়। মাঠের বাস্তবতা তিনি কাছ থেকে দেখেন। কৃষকের জীবন, কৃষকের সমস্যা, বাজারের চাহিদা এবং পরিশ্রমের মূল্য—এসব বিষয় তিনি কর্মজীবনের শুরুতেই উপলব্ধি করেন। অনেকেই একটি চাকরিকে শুধু জীবিকার উপায় হিসেবে দেখেন, কিন্তু তিনি সেই কাজকে শেখার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। ধৈর্য ধরে কাজ করা, মানুষের আস্থা অর্জন করা এবং দায়িত্বের প্রতি সৎ থাকা—এই গুণগুলো তাঁর ভেতরে তখন থেকেই গড়ে উঠতে থাকে। একজন কর্মী হিসেবে শুরু করেও তিনি নিজেকে শুধু একজন কর্মচারী হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর চোখে ছিল বড় কিছু করার স্বপ্ন।

 

সেই স্বপ্ন থেকেই একসময় তিনি উদ্যোক্তা হওয়ার পথে পা বাড়ান। আনুমানিক দশ বছর আগে তিনি পিওর ক্রপস লিমিটেড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে উদ্যোক্তা হন। পাশাপাশি তিনি পিসিএল এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একজন কর্মী থেকে উদ্যোক্তা হওয়া সহজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন সাহস, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা। তিনি সেই সাহস দেখিয়েছেন। নিজের অভিজ্ঞতা, মাঠের জ্ঞান এবং মানুষের প্রতি আস্থাকে পুঁজি করে তিনি একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য কৃষি ও কৃষকের কল্যাণ। পিসিএল এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের স্লোগানেই সেই লক্ষ্যের প্রতিফলন রয়েছে—কৃষি ও কৃষকের আস্থা, কৃষকের সমৃদ্ধি। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি শুধু ব্যবসা সম্প্রসারণের কথা ভাবেননি, বরং কৃষকের মুখে হাসি ফোটানোর কথাও ভেবেছেন।

 

দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার স্বপ্ন তাঁকে প্রতিদিন ছুটিয়ে বেড়ায়। তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে প্রতিদিন ছুটে বেড়াচ্ছেন। কৃষকদের কাছে পৌঁছানো, তাদের প্রয়োজন বোঝা এবং কৃষির উন্নয়নে কাজ করা তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ জীবন অনেকাংশে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষক ভালো থাকলে দেশ ভালো থাকে—এই বিশ্বাস থেকেই তিনি কৃষি ও কৃষকদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। কৃষকের হাতে মানসম্মত কৃষি উপকরণ পৌঁছে দেওয়া, তাদের আস্থা অর্জন করা এবং ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করা তাঁর কাজের মূল উদ্দেশ্য। তিনি মনে করেন, কাজই মানুষের আসল পরিচয়। আর মানুষের কল্যাণই তাঁর লক্ষ্য। এই ভাবনা তাঁকে শুধু একজন ব্যবসায়ী হিসেবে নয়, একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবেও আলাদা করে তোলে।

 

ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব পালনেও তিনি পিছিয়ে নেই। এলাকার অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তিনি মাসিক আয়ের একটি বড় অংশ দান করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। এই দান তিনি প্রচারের জন্য করেন না। বরং মানুষের কল্যাণে নীরবে কাজ করাই তাঁর স্বভাব। সদা হাস্যজ্জ্বল এই মানুষটি সকলের পরিচিত একজন সাদা মনের গুণী মানুষ। তাঁর ব্যবহার, বিনয় এবং মানুষের প্রতি আন্তরিকতা তাঁকে এলাকার মানুষের কাছে আপন করে তুলেছে। ধনী হওয়ার পরও তিনি মাটির মানুষ হিসেবে থাকতে পেরেছেন। এই গুণটাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। সমাজে অনেক সফল মানুষ থাকেন, কিন্তু সবাই নিজের আয়ের একটি বড় অংশ অন্যের কল্যাণে ব্যয় করেন না। তিনি সেই ব্যতিক্রমী উদাহরণ, যিনি সাফল্যকে শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং তা সমাজের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন।

 

রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও নোংরা রাজনীতি অপছন্দ করেন। তাঁর কাছে রাজনীতি মানে মানুষের সেবা, দেশের কল্যাণ এবং ন্যায়ের পক্ষে থাকা। ক্ষমতা বা স্বার্থের রাজনীতি তাঁর পছন্দ নয়। তিনি দেশ, মাটি ও মানুষের কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এই মনোভাব তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি বড় দিক। আজকের সমাজে যেখানে অনেক ক্ষেত্রে স্বার্থপরতা ও নোংরা প্রতিযোগিতা দেখা যায়, সেখানে তাঁর মতো মানুষের উপস্থিতি আশার আলো জাগায়। তাঁর মতো গুণী মানুষ আজকের ঘুণেধরা সমাজে বড্ড বেশি দরকার। কারণ সমাজকে এগিয়ে নিতে শুধু অর্থ বা ক্ষমতা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সততা, মানবিকতা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা। আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ সেই মানবিক মূল্যবোধেরই প্রতিনিধিত্ব করেন।

 

সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তিনি সাতক্ষীরায় বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এছাড়া তিনি দেশের কৃষি ও কৃষকদের নিয়ে প্রকাশিত একমাত্র জাতীয় পত্রিকা কৃষক কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। একটি পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব শুধু একটি পদ নয়, বরং কৃষকের কণ্ঠস্বরকে তুলে ধরার একটি মাধ্যম। কৃষকের সমস্যা, সম্ভাবনা, সাফল্য এবং সংগ্রামের কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এই পত্রিকার মাধ্যমে সম্ভব হয়। কৃষি ও কৃষকদের নিয়ে কাজ করা একটি পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থাকা তাঁর কৃষিপ্রেমেরই আরেকটি প্রমাণ। তিনি বিশ্বাস করেন, কৃষকদের কথা শুনতে হবে, তাদের সম্মান করতে হবে এবং তাদের উন্নয়নে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি সাংবাদিকতা ও সামাজিক সংগঠনের কাজেও নিজেকে যুক্ত রেখেছেন।

 

পিসিএল এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের মাধ্যমে তিনি কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। প্রতিষ্ঠানটির বিশেষ উপহার প্রোগ্রামসহ বিভিন্ন উদ্যোগ কৃষকদের উৎসাহিত করার একটি চেষ্টা হিসেবে দেখা যায়। তাঁর মতে, কৃষক যদি উপকৃত হন, তাহলে কৃষি এগিয়ে যাবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে। এই ভাবনা থেকেই তিনি কৃষকের আস্থা অর্জনকে ব্যবসার চেয়ে বড় সম্পদ মনে করেন। একজন উদ্যোক্তার জন্য লাভ গুরুত্বপূর্ণ হলেও, মানুষের বিশ্বাস ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। এটাই তাঁর ব্যবসায়িক দর্শনের মূল কথা।

 

সবচেয়ে বড় কথা, তিনি সম্পূর্ণ প্রচারবিমুখ একজন মানুষ। সাফল্য পাওয়ার পরও তিনি নিজেকে প্রচারের আলোয় আনার চেষ্টা করেন না। বরং নীরবে কাজ করে যাওয়াই তাঁর পছন্দ। আজকের যুগে যেখানে অনেকেই সামান্য কাজ করেই প্রচার চান, সেখানে তাঁর এই প্রচারবিমুখতা বিরল। তিনি মনে করেন, ভালো কাজের প্রচার মানুষের ভালোবাসার মধ্য দিয়েই হয়।

 

তাঁর এলাকার মানুষের ভালোবাসা ও প্রশংসাই তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন। একজন কর্মী থেকে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হওয়ার এই যাত্রা তরুণদের জন্য একটি বার্তা দেয়—পরিশ্রম করলে, সৎ থাকলে এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করলে সাফল্য একদিন আসবেই।

 

আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহের জীবন সেই বার্তারই জীবন্ত উদাহরণ। দেশ, মাটি ও মানুষের কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া এই সাদা মনের গুণী মানুষটি আগামী দিনেও কৃষক ও সমাজের জন্য আলো ছড়িয়ে যাবেন, এটাই সকলের প্রত্যাশা।


এই বিভাগের আরো খবর

https://www.kaabait.com